যমুনা রেলওয়ে সেতু প্রকল্পে হাজার কোটি টাকার অনিয়ম, দুর্নীতি ও আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগকে ঘিরে দেশের অন্যতম বৃহৎ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) এবং যমুনা রেলওয়ে সেতু প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমানের বিরুদ্ধে টেন্ডার কারসাজি, অতিরিক্ত ব্যয়, ভুয়া বিল-ভাউচার, কর ফাঁকি, ঠিকাদারপ্রীতি এবং সরকারি অর্থের অপচয়ের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের প্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধান শুরু করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন অডিট প্রতিবেদনে প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়ম ও আর্থিক ক্ষতির বিষয়ও উঠে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
দেশের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে যমুনা নদীর ওপর পৃথক রেলসেতু নির্মাণ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত। বঙ্গবন্ধু সেতুতে ফাটল দেখা দেওয়ার পর ট্রেন চলাচলের গতি সীমিত হয়ে পড়ে, যার ফলে উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রেল যোগাযোগে দীর্ঘদিন ধরে নানা জটিলতা সৃষ্টি হয়। এই প্রেক্ষাপটে পৃথক রেলসেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রকল্পটির মোট ব্যয় নির্ধারণ করা হয় প্রায় ১৬ হাজার ৭৮১ কোটি ৯৬ লাখ টাকা, যার বড় অংশ অর্থায়ন করেছে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কয়েকটি জাপানি প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করে।
তবে উদ্বোধনের পর প্রকল্পটি এখন শুধু অবকাঠামোগত সাফল্যের আলোচনায় সীমাবদ্ধ নেই; বরং এর ব্যয়, বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন ধাপে এমন কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা সরকারের বিপুল আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়েছে। বিশেষ করে SPSP বা স্টিল পাইপ শিট পাইল প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। অডিট প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, প্রয়োজনীয়তা ও যৌক্তিকতা যথাযথভাবে যাচাই না করেই এই প্রযুক্তি অন্তর্ভুক্ত করার ফলে সরকারের প্রায় ৭ হাজার ৪৬ কোটি ৮৮ লাখ ৬৩ হাজার টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এ বিষয়ে আপত্তি উত্থাপন করা হয় এবং ব্যাখ্যা প্রদান ও নিষ্পত্তির সুপারিশ করা হয়।
প্রকল্পে ভুয়া বিল-ভাউচার এবং যথাযথ পরিমাপ ছাড়াই বিপুল অর্থ পরিশোধের অভিযোগও উঠেছে। বৈদেশিক সহায়তাপ্রাপ্ত প্রকল্প অডিট অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একটি অর্থবছরেই প্রায় ৭০৫ কোটি ৭৬ লাখ টাকার ব্যয় নিয়ে অডিট আপত্তি ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, ডিটেইল মেজারমেন্ট শিট, অনুমোদিত ড্রয়িং এবং বিল অব কোয়ান্টিটির মতো গুরুত্বপূর্ণ নথি ছাড়াই প্রায় ১২৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। এছাড়া রিপ্লেসমেন্ট কনসালটেন্টের নামে আরও প্রায় ১৪ কোটি ৬০ লাখ টাকার অনিয়মিত বিল পরিশোধের অভিযোগ রয়েছে।
ভ্যাট ও কর ব্যবস্থাপনাতেও গুরুতর অসঙ্গতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। অডিটে বলা হয়েছে, যথাযথ ভাউচার ছাড়াই সিডি-ভ্যাট বাবদ প্রায় ৩৪ কোটি ৬১ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। ব্যবহার না হওয়া SPSP সামগ্রীর বিপরীতে প্রায় ৫ কোটি ৬৩ লাখ টাকার শুল্ক ও ভ্যাট প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া ঠিকাদারদের বিল থেকে ভ্যাট ও আয়কর কর্তন না করায় সরকারের প্রায় ১৭ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। একইভাবে সিডি-ভ্যাটের নামে অতিরিক্ত প্রায় ১১ কোটি টাকা পরিশোধ এবং পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের বিল থেকে প্রায় ২ কোটি ৭০ লাখ টাকা কম আয়কর কাটা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
রিটেনশন বিল থেকে ভ্যাট ও আয়কর কর্তন না করার ফলে আরও প্রায় ৩৪ কোটি টাকার সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতির আশঙ্কার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অডিট প্রতিবেদনে প্রকল্পের সময় ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হলেও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ডিলে ড্যামেজ বা জরিমানা আরোপ করা হয়নি। এর ফলে সরকারের প্রায় ৯৯ কোটি টাকার সম্ভাব্য ক্ষতি হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
মোবিলাইজেশন ও ডিমোবিলাইজেশন ব্যয়ও অডিট পর্যবেক্ষণের আওতায় এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ খাতে প্রায় ৪ হাজার ১৫২ কোটি জাপানি ইয়েন বা প্রায় ৪১০ কোটি ৬৬ লাখ টাকার ব্যয়কে বিশেষ পর্যবেক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়া প্রয়োজনীয় সহায়ক নথি ছাড়া আরও প্রায় ৫ কোটি ৭৪ লাখ টাকার ব্যয় দেখানোর অভিযোগ রয়েছে।
২০২২–২৩ অর্থবছরের বিশেষ আর্থিক পরিদর্শন প্রতিবেদনে আরও কিছু অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, চুক্তিতে নির্ধারিত দেশ থেকে পণ্য আমদানি না করেই প্রায় ৪০৫ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। Country of Origin যথাযথভাবে যাচাই না করেই অর্থ ছাড় দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া অতিরিক্ত SPSP আমদানির মাধ্যমে প্রায় ১০৬ কোটি ২৭ লাখ টাকা শুল্ক ও ভ্যাট পরিশোধ করা হয়েছে।
কাস্টমস হাউসের প্রচলিত পদ্ধতি অনুসরণ না করে সিডি-ভ্যাট আদায়ের নামে আরও প্রায় ৪৩০ কোটি টাকার লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে।
অডিট প্রতিবেদনে বিভিন্ন প্যাকেজে অস্বাভাবিক উচ্চ দর ধরে কাজ প্রদান করার অভিযোগও রয়েছে। এতে সরকারকে অতিরিক্ত প্রায় ১ হাজার ২২১ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে দরপত্রের শর্ত লঙ্ঘন করে ইউনিট রেট বৃদ্ধি এবং নেগোশিয়েশনের মাধ্যমে আরও প্রায় ১ হাজার ৭২৬ কোটি টাকার সম্ভাব্য ক্ষতির অভিযোগও উত্থাপিত হয়েছে।
প্রকল্পে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। রেল ট্র্যাকে নির্ধারিত মানের পরিবর্তে বড় আকারের ও নিম্নমানের পাথর ব্যবহার করা হলেও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে ৪৫ কোটি টাকার বেশি বিল পরিশোধ করা হয়েছে। এছাড়া নন-টেন্ডার কাজ দেখিয়ে প্রায় ৮ কোটি ৭৪ লাখ টাকা পরিশোধের অভিযোগও রয়েছে।
অডিট নথি অনুযায়ী, মাঠ পর্যায়ের কিছু প্রকৌশলী ব্যয় কমানো, কম দর বিবেচনা করা এবং কাজের পরিমাপ পুনরায় যাচাইয়ের সুপারিশ করেছিলেন। তবে প্রকল্প পরিচালকের পর্যায়ে সেই সুপারিশগুলো উপেক্ষা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন নোটে প্রকল্পের গুরুত্ব এবং দ্রুত বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে উচ্চ দর বহাল রাখার পক্ষে মত দেওয়া হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
এর ফলে প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরকারি অর্থের অপচয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে সমালোচকরা মনে করছেন।
এদিকে দুর্নীতি দমন কমিশনে দায়ের করা অভিযোগে আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমানের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়টিও উঠে এসেছে। অভিযোগকারী দাবি করেছেন, তিনি দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে বিভিন্ন প্রকল্পে প্রভাব বিস্তার করেছেন এবং পছন্দের কিছু ঠিকাদারকে সুবিধা দিয়েছেন। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, তিনি বিভিন্ন প্রকল্প থেকে কমিশন গ্রহণের মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন।
তার নামে রাজধানীর অভিজাত এলাকায় ফ্ল্যাট, কক্সবাজারে সম্পদ, পরিবারের সদস্যদের নামে জমি এবং বিভিন্ন ব্যাংকে উল্লেখযোগ্য অঙ্কের অর্থ লেনদেনের তথ্য রয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ যাচাই এখনো সম্পন্ন হয়নি।
দুদক ইতোমধ্যে অভিযোগগুলোর অনুসন্ধান শুরু করেছে বলে জানা গেছে। অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে প্রকল্পের প্রশাসনিক অনুমোদন, আর্থিক বরাদ্দ, টেন্ডার ডকুমেন্ট, দরপত্র মূল্যায়ন প্রতিবেদন, কার্যাদেশ, চুক্তিপত্র এবং বিল-ভাউচারসহ বিভিন্ন নথি সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, অনুসন্ধান শেষ হলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।
তবে উল্লেখ্য, অডিট আপত্তি বা অনুসন্ধান শুরু হওয়া মানেই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়। সরকারি প্রকল্পে অডিটের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রশ্ন ও আপত্তি উত্থাপিত হওয়া স্বাভাবিক বিষয়। পরবর্তী সময়ে ব্যাখ্যা, তদন্ত এবং আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হয়। তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত অভিযোগগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রকল্প পরিচালক আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে তার পক্ষ থেকে কোনো ব্যাখ্যা বা অবস্থান জনসমক্ষে আসেনি।
ভবিষ্যতে তিনি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে বক্তব্য দিলে ঘটনার অন্য দিকও সামনে আসতে পারে।
দেশের ইতিহাসে অন্যতম ব্যয়বহুল রেল অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে যমুনা রেলওয়ে সেতু বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে রেল যোগাযোগ আরও দ্রুত ও কার্যকর হওয়ার কথা। তবে প্রকল্পটি ঘিরে উত্থাপিত দুর্নীতি, আর্থিক অনিয়ম ও জবাবদিহির প্রশ্ন এখন নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
অনুসন্ধান ও তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে শুধু এই প্রকল্প নয়, ভবিষ্যতের বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিও নিশ্চিত করা সহজ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ওয়েবসাইট এর কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পুর্ণ বেআইনি